বাংলা বানানের নিয়ম: বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানের সহজ নির্দেশিকা (উদাহরণসহ)
বাংলাদেশে প্রমিত বানানের মানদণ্ড বাংলা একাডেমির নিয়ম। মূল কথা: তৎসম শব্দ অপরিবর্তিত, অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-উ (বাড়ি, সরকারি), ণ নয় ন, বিদেশি শব্দে স, আর কি-কী ও কোনো-কোন আলাদা।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
বাংলাদেশে পাঠ্যবই, সরকারি দপ্তর, সংবাদপত্র ও পরীক্ষার উত্তরে যে বানান মানা হয়, তার ভিত্তি বাংলা একাডেমির "প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম"। এই নিয়ম প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে, পরে তা সংশোধিত হয়েছে (এই সংশোধনের ইতিহাস আলাদা গাইডে আছে)। পুরো নিয়মমালা অনেক বড়, কিন্তু প্রতিদিনের লেখায় বেশির ভাগ ভুল হয় হাতে-গোনা কয়েকটি জায়গায়। সেগুলো মনে রাখলেই লেখা অনেক পরিষ্কার হয়:
- তৎসম শব্দ (সংস্কৃত থেকে অবিকৃত আসা শব্দ) মূল বানানেই লেখা হয়: পরীক্ষা, নীতি, উপকারী।
- অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-কার ও উ-কার: বাড়ি, গাড়ি, পাখি, সরকারি।
- অতৎসম শব্দে ণ নয়, ন: কোরান, ইরান, রানি। তৎসম শব্দে ট-বর্গের আগে ও ঋ, র, ষ-এর পরে ণ বসে: ঘণ্টা, কারণ।
- বিদেশি শব্দে স, ষ নয়: স্টেশন, স্কুল, মাস্টার।
- কি ও কী, কোনো ও কোন আলাদা অর্থ বহন করে।
এই গাইডে প্রতিটি নিয়মের সঙ্গে শুদ্ধ-অশুদ্ধ জোড়া, ব্যতিক্রমের সতর্কতা আর AdeptWrite-এর টুল দিয়ে যাচাইয়ের উপায় আছে।
বানানের মানদণ্ড কে ঠিক করে
বাংলা বানানের কোনো একক বিশ্বব্যাপী কর্তৃপক্ষ নেই। দুটি প্রতিষ্ঠানের নিয়মই সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়:
| কর্তৃপক্ষ | কোথায় প্রভাব বেশি | মূল নথি |
|---|---|---|
| বাংলা একাডেমি, ঢাকা | বাংলাদেশের পাঠ্যবই, সরকারি কাজ, সংবাদমাধ্যম | প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম (প্রথম প্রকাশ ১৯৯২) |
| পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা | পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশনা ও শিক্ষা | আকাদেমি বানান অভিধান (১৯৯৭) |
AdeptWrite-এর বাংলা বানান চেকার বাংলা একাডেমির নিয়মকে মানদণ্ড ধরে। এই গাইডে একাডেমির নিয়মের হুবহু উদ্ধৃতি নেই; আছে নিয়মের মূল ভাব আর সুপরিচিত উদাহরণ। কোনো শব্দ নিয়ে সন্দেহ থাকলে একাডেমির সর্বশেষ নিয়ম ও অভিধান দেখে নিন। বিনা মূল্যে ব্যবহারযোগ্য একটি অনলাইন অভিধান হলো বাংলাদেশ সরকারের অভিগম্য অভিধান (পাতাটি ২০২৬-১১-০১ তারিখে খুলেছে)।
নিয়ম ১: তৎসম, অতৎসম আর বিদেশি শব্দ আলাদা করুন
প্রায় সব নিয়ম এই ভাগের ওপর দাঁড়িয়ে, তাই আগে ভাগটা বুঝে নিন।
- তৎসম: সংস্কৃত থেকে সরাসরি আসা শব্দ। যেমন: পরীক্ষা, শিক্ষা, বিদ্যালয়, মন্ত্রী, জীবন, দীর্ঘ, শূন্য, পূর্ব।
- অতৎসম দেশি ও তদ্ভব শব্দ: বাংলার নিজের শব্দ বা বদলে আসা শব্দ। যেমন: বাড়ি, গাড়ি, পাখি, কুমির, চুরি, ঝুড়ি।
- বিদেশি শব্দ: আরবি, ফারসি, ইংরেজি, পর্তুগিজ ইত্যাদি থেকে আসা শব্দ। যেমন: কলম, সরকার, স্টেশন, ইরান।
তৎসম শব্দের বানান সংস্কৃতের মতোই থাকে। ঝামেলাটা অতৎসম ও বিদেশি শব্দে, যেখানে পুরোনো অভ্যাসে দীর্ঘ ঈ-কার, মূর্ধন্য ণ আর ষ বসানো হতো।
নিয়ম ২: অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-কার ও উ-কার
অতৎসম শব্দে ই-কার ও উ-কার হ্রস্ব (ি, ু) হবে। দীর্ঘ ী, ূ রাখা হয় শুধু তৎসম শব্দে।
| শুদ্ধ | অশুদ্ধ (পুরোনো বা ভুল) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| বাড়ি | বাড়ী | দেশি শব্দ |
| গাড়ি | গাড়ী | দেশি শব্দ |
| পাখি | পাখী | দেশি শব্দ |
| সরকারি | সরকারী | সরকার (ফারসি) + ই |
| কুমির | কুমীর | তদ্ভব |
| বাঁশি | বাঁশী | তদ্ভব |
| পুলিশ | পুলীশ | ইংরেজি থেকে |
| ইংরেজি | ইংরেজী | ভাষার নাম |
| বাংলাদেশি | বাংলাদেশী | জাতি ও বিশেষণ |
তৎসম হলে দীর্ঘ ী থাকে: উপকারী, ধনী, প্রতিযোগী, মন্ত্রী, পরীক্ষা, নীতি। এ কারণেই "উপকারী" ঠিক, কিন্তু "সরকারি" ঠিক, "সরকারী" নয়। প্রত্যয়টি দেখতে এক, কিন্তু শব্দটির উৎস আলাদা।
ব্যক্তিনামের বেলায়: মানুষের নাম সাধারণত নামধারীর নিজের পছন্দের বানানে লেখা হয় (যেমন কেউ "সুমী", কেউ "সুমি")। অন্যের নাম লিখতে গেলে তাঁর নিজের লেখা বানানটাই অনুসরণ করা ভালো।
নিয়ম ৩: ণ-ত্ব বিধান, কোথায় ণ আর কোথায় ন
সহজ ভাষায় সূত্র:
- তৎসম শব্দে ট-বর্গের (ট, ঠ, ড, ঢ) সঙ্গে যুক্ত নাসিক্য ধ্বনি ণ: কণ্ঠ, কাণ্ড, দণ্ড, লুণ্ঠন।
- তৎসম শব্দে ঋ, র, ষ-এর পরে স্বরবর্ণ, য়, হ, ং ইত্যাদি এলে ন বদলে ণ হয়: ঋণ, কারণ, বর্ণ, তৃণ, ভূষণ, মরণ। মাঝখানে ক-বর্গ, প-বর্গ, চ-বর্গ, ত-বর্গ বা শ, স থাকলে সাধারণত ন-ই থাকে: দর্শন, অর্জন, প্রার্থনা। (এই তালিকার ব্যতিক্রম আছে, তাই কঠিন শব্দে অভিধান দেখুন।)
- অতৎসম ও বিদেশি শব্দে ণ নয়, ন: কোরান, ইরান, রানি, সোনা, কান, কর্নেল, হর্ন।
| শুদ্ধ | অশুদ্ধ | কারণ |
|---|---|---|
| ঘণ্টা | ঘন্টা | ট-বর্গের আগে ণ |
| কণ্ঠ | কন্ঠ | ট-বর্গের সঙ্গে যুক্ত |
| কারণ | কারন | র-এর পরে ণ |
| কোরান | কোরাণ | বিদেশি শব্দে ন |
| ইরান | ইরাণ | বিদেশি শব্দে ন |
| রানি | রাণী | অতৎসম শব্দ |
ঠান্ডা, কান্ড বা এ ধরনের কিছু শব্দ নিয়ে লেখকদের মধ্যে দুই রকম চল আছে। এ ক্ষেত্রে আপনার প্রতিষ্ঠান, প্রকাশক বা শিক্ষকের নির্দেশনা দেখুন এবং গোটা লেখায় একই রূপ রাখুন।
নিয়ম ৪: ষ-ত্ব বিধান ও বিদেশি শব্দের স
মূর্ধন্য ষ প্রধানত তৎসম শব্দে বসে: ভাষা, বিষয়, ষষ্ঠ, কৃষক। বিদেশি শব্দে ইংরেজি s-এর ধ্বনি বোঝাতে দন্ত্য স বসে।
| শুদ্ধ | অশুদ্ধ |
|---|---|
| স্টেশন | ষ্টেশন |
| স্কুল | ষ্কুল |
| মাস্টার | মাষ্টার |
| স্টিমার | ষ্টিমার |
শ, ষ, স তিনটির কোনটি বসবে, তা তৎসম শব্দে মূল শব্দের ওপর নির্ভর করে, আন্দাজে ঠিক করা যায় না। কঠিন শব্দে অভিধান দেখাই নিরাপদ।
নিয়ম ৫: য়, ড়, ঢ় এবং ইউনিকোড
য়, ড়, ঢ় ধ্বনিগুলো দেখতে এক বর্ণের মতো, কিন্তু ইউনিকোডের মানদণ্ডে এগুলো মূল বর্ণ + নুক্তা (়, U+09BC) হিসেবে সংরক্ষিত হয়। অর্থাৎ ড়-কে সংরক্ষণ করা হয় ড আর ় মিলিয়ে। দেখতে একই হলেও ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে টাইপ করা পাঠ্যে ভেতরের সংকেত আলাদা হতে পারে। ফলে অনুসন্ধান, মিলিয়ে দেখা ও বানান যাচাইয়ে গোলমাল হয়।
শুদ্ধ উদাহরণ: বায়ু, ভয়, গড়, বড়, আষাঢ়, দৃঢ়। অক্ষরের বিন্যাসে সমস্যা হলে লেখাটি এমন কিবোর্ড বা টুলে পেস্ট করুন, যা মূল বর্ণ আর নুক্তা মিলিয়ে সঠিকভাবে সাজায়। AdeptWrite-এর বানান চেকার এই নুক্তা-বিন্যাসটি একটি যান্ত্রিক নিয়ম দিয়ে পরীক্ষা করে।
নিয়ম ৬: কি ও কী
দুটির ব্যবহার আলাদা।
- কি: হ্যাঁ বা না উত্তরের প্রশ্নে। যেমন: তুমি কি আসবে? এটা কি ঠিক?
- কী: "কোন জিনিস", "কেমন", "কত" অর্থে। যেমন: তুমি কী খাবে? তোমার নাম কী? কী সুন্দর দৃশ্য!
| শুদ্ধ | অশুদ্ধ | কেন |
|---|---|---|
| আপনি কি চা খাবেন? | আপনি কী চা খাবেন? | উত্তর হ্যাঁ বা না |
| আপনি কী খাবেন? | আপনি কি খাবেন? | কোন জিনিস, তাই কী |
সহজ পরীক্ষা: প্রশ্নের উত্তর "হ্যাঁ" বা "না" দিয়ে দেওয়া যায় কি? তাহলে কি। যদি উত্তরে একটি জিনিস, কাজ বা অবস্থা বলতে হয়, তাহলে কী। AdeptWrite-এর পরীক্ষাটি এখানে অনুমান-ভিত্তিক, তাই এটি শুধু পরামর্শ দেয়, চূড়ান্ত রায় দেয় না।
নিয়ম ৭: কোনো ও কোন, কখনো, ভালো
একই কারণে দুটি শব্দ পাশাপাশি দেখা যায়।
- কোনো মানে "যেকোনো একটি, অনির্দিষ্ট": কোনো সমস্যা নেই। কোনো দিন আসবেন।
- কোন মানে "কোন একটি, নির্বাচন" (প্রশ্ন): কোন পথে যাব? কোন বইটা নেবে?
শব্দের শেষে ও-কার দিয়ে লেখা অন্যান্য একাডেমি-সম্মত রূপ: কখনো, এখনো, কোনো, ভালো, কালো, আলো। এগুলো পুরোনো লেখায় "কখনও", "ভাল" আকারে চোখে পড়ে। সব কয়টি নিয়ে সবার ঐকমত্য নেই, তাই পুরোনো বই থেকে বানান কপি করলে সাবধান থাকুন।
একটি অনুচ্ছেদে শুধরানোর পূর্বাপর নমুনা
নিচের অনুচ্ছেদটি পুরোনো অভ্যাসের বানানে লেখা। একবার পড়ে দেখুন কোথায় কোথায় আটকাচ্ছে।
আগে:
সরকারী স্কুলের ছাত্রীরা ষ্টেশনের কাছে একটি পাখীর ছবি এঁকেছে। ঘন্টা বাজার পর শিক্ষক জানতে চাইলেন, কোন সমস্যা আছে কী? রাণী নামের মেয়েটি বলল, তার বাড়ী অনেক দূর।
পরে:
সরকারি স্কুলের ছাত্রীরা স্টেশনের কাছে একটি পাখির ছবি এঁকেছে। ঘণ্টা বাজার পর শিক্ষক জানতে চাইলেন, কোনো সমস্যা আছে কি? রানি নামের মেয়েটি বলল, তার বাড়ি অনেক দূর।
কী কী বদলেছে: সরকারী → সরকারি, ষ্টেশন → স্টেশন, পাখী → পাখি, ঘন্টা → ঘণ্টা, "কোন সমস্যা" → কোনো সমস্যা, "আছে কী?" → "আছে কি?" (উত্তর হ্যাঁ-না), রাণী → রানি, বাড়ী → বাড়ি। মোট আটটি বদল, আর প্রতিটির পেছনে ওপরের একটি নিয়ম কাজ করছে। শেষ বাক্যের "রানি" নামটি আসলে ব্যক্তিনাম হলে মেয়েটির নিজের পছন্দের বানানই লেখা উচিত।
নিয়মগুলো কেন এমন
হ্রস্ব ই-কার ও উ-কারের নিয়মের পেছনে মূল যুক্তি লেখার সরলতা। কথ্য বাংলায় হ্রস্ব ও দীর্ঘ ই-র উচ্চারণে তফাত প্রায় নেই। তাই তৎসম শব্দের বাইরে দুই রকম চিহ্ন মুখস্থ রাখার কোনো ধ্বনিগত কারণ থাকে না। একই যুক্তিতে অতৎসম শব্দে ণ-এর বদলে ন আসে। বাংলা উচ্চারণে ন আর ণ-এর পার্থক্য সাধারণত শোনা যায় না, তাই কোন শব্দে ণ বসবে, তা মুখস্থ করতে হয় তৎসম শব্দের ক্ষেত্রেই। এই যুক্তিগুলো সংস্কারের লক্ষ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। বিস্তারিত আলাদা বানান সংস্কারের গাইডে।
কম্পিউটার ও ফোনে টাইপের সময় বানানের বাড়তি সমস্যা
বানানের নিয়ম জানা থাকলেও টাইপের সময় আলাদা ধরনের গোলমাল হয়। ফোনের কিবোর্ডে স্বয়ংক্রিয় সংশোধন অনেক সময় শব্দ বদলে দেয়, আবার কিছু কিবোর্ডে যুক্তাক্ষর (ষ্ট, স্ট, ণ্ড) গঠনের ক্রম আলাদা। পুরোনো ফন্ট-নির্ভর লেখা থেকে ইউনিকোডে রূপান্তর করলে ও-কার, এ-কার আর রেফের ক্রম কখনো উল্টে যায়। তাই অন্য ফাইল থেকে বাংলা লেখা তুলে আনলে ভালোভাবে পড়ে দেখুন, বিশেষ করে য়, ড়, ঢ় আর যুক্তাক্ষরগুলো। সন্দেহ হলে লেখাটি বানান চেকারে একবার চালিয়ে নিন।
নিজে চেষ্টা করুন: পাঁচটি বাক্য শুধরান
- আমাদের বাড়ীর সামনে একটি ষ্টেশন আছে।
- তুমি কী কাল আসবে?
- কোন অসুবিধা হলে জানাবেন।
- ঘন্টা বাজলেই ক্লাস শুরু।
- সরকারী নির্দেশ মেনে চলুন।
উত্তর: (১) বাড়ির সামনে একটি স্টেশন আছে। (২) তুমি কি কাল আসবে? (৩) কোনো অসুবিধা হলে জানাবেন। (৪) ঘণ্টা বাজলেই ক্লাস শুরু। (৫) সরকারি নির্দেশ মেনে চলুন। প্রতিটি বাক্যে এই গাইডের একটি করে নিয়ম কাজ করেছে। নিজের সাম্প্রতিক কোনো লেখা নিয়েও একই অনুশীলন করে দেখতে পারেন।
সন্দেহ হলে তিন ধাপে সিদ্ধান্ত
- শব্দের উৎস ভাবুন। সংস্কৃত থেকে এসেছে (তৎসম), না দেশি বা বিদেশি? তৎসম হলে অভিধানে মূল বানান দেখুন।
- অভিধান দেখুন। বাংলা একাডেমির অভিধান বা বিশ্বস্ত অনলাইন অভিধান থেকে বানান মিলিয়ে নিন।
- সামঞ্জস্য রাখুন। পুরো লেখায় একই বানান রাখুন। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা দিলে সেটিই চূড়ান্ত।
ঢাকা ও কলকাতার পার্থক্য
দুই আকাদেমির মূল দর্শন কাছাকাছি: অতৎসম শব্দের বানান সরল করা, তৎসম শব্দ অক্ষুণ্ণ রাখা। বাড়ি, গাড়ি, পাখির মতো প্রচলিত শব্দের ক্ষেত্রে কার্যত পার্থক্য নেই। তবু কিছু শব্দে ও ভাঙা-জোড়া, হাইফেন বা বিদেশি শব্দের বানানে ভিন্নতা পাওয়া যায়, আর কিছু শব্দ নিয়ে প্রকাশকদের ঘরানাও আলাদা। আমরা দুই অভিধান শব্দে শব্দে মিলিয়ে দেখিনি, তাই কোন শব্দে কী পার্থক্য, তা এখানে দাবি করছি না। কলকাতার পাঠকের জন্য লিখলে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির অভিধান দেখে নিন। বাংলাদেশের পাঠকের জন্য লিখলে বাংলা একাডেমির নিয়মই মানদণ্ড।
নিজের লেখায় একটি নিয়ম বেছে নিন আর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেটি ধরে রাখুন। এক লেখায় "সরকারি" আর "সরকারী" মিশে গেলে তা-ই সবচেয়ে বড় ত্রুটি।
লিখে শেষ করার পর বানান যাচাইয়ের তালিকা
- সব ই-কার ও উ-কার দেখুন: দেশি ও বিদেশি শব্দে হ্রস্ব তো?
- ণ ও ন: অতৎসম শব্দে ণ বসেনি তো?
- বিদেশি শব্দে ষ্ট, ষ্ক-এর মতো রূপ আছে কি? থাকলে স্ট, স্ক করুন।
- প্রতিটি কি/কী প্রশ্নটি পড়ে দেখুন: উত্তর হ্যাঁ-না, না কোনো জিনিস?
- কোনো আর কোন: অনির্দিষ্ট, না নির্বাচন?
- বাক্যের শেষে দাঁড়ি (।) আছে, ইংরেজি ফুলস্টপ (.) নয়। বিস্তারিত যতিচিহ্নের গাইডে এবং কমার নিয়মে।
- সংখ্যা বাংলা না ইংরেজি অঙ্কে, একই লেখায় এক রীতি রাখুন।
- একই শব্দ লেখার সব জায়গায় একই বানানে আছে কি?
পরীক্ষা, অফিস ও অনলাইন লেখায় বানান
স্কুল-কলেজের পরীক্ষা: পাঠ্যবইয়ের বানান বাংলা একাডেমির নিয়ম মেনে ছাপা হয়। উত্তরপত্রে বই-এর বানান ধরে লিখলে সবচেয়ে নিরাপদ। শিক্ষক বিশেষ নির্দেশনা দিলে সেটাই চূড়ান্ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস ও প্রবন্ধ: বিভাগ বা জার্নালের নির্দেশিকায় বানান-রীতি আলাদা করে থাকতে পারে। থাকলে সেটি মানুন। না থাকলে একাডেমির নিয়ম ধরুন আর পাদটীকা ও সূত্রনির্দেশের রীতিও একই রকম সামঞ্জস্যে রাখুন।
চাকরির আবেদন ও অফিসের চিঠি: বানানভুল প্রথম ধারণাতেই ক্ষতি করে। আবেদন পাঠানোর আগে একবার বানান চেক করে নিন।
ফেসবুক, ব্লগ ও ওয়েব লেখা: ঘরোয়া লেখায় কথ্য রূপ চলে, কিন্তু সংবাদ, ব্লগ বা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের লেখায় প্রমিত বানান পাঠকের আস্থা বাড়ায়।
সাধারণ ভুলের সংক্ষিপ্ত তালিকা
- সরকারী, বাড়ী, গাড়ী, পাখী: আসলে সরকারি, বাড়ি, গাড়ি, পাখি।
- ঘন্টা, কন্ঠ: আসলে ঘণ্টা, কণ্ঠ।
- রাণী, কোরাণ, ইরাণ: আসলে রানি, কোরান, ইরান।
- ষ্টেশন, ষ্টিমার: আসলে স্টেশন, স্টিমার।
- কি ও কী গুলিয়ে ফেলা: হ্যাঁ-না প্রশ্নে কি, বাকি ক্ষেত্রে কী।
- "কোন" লিখে "কোনো" বোঝানো: "কোন সমস্যা নেই" নয়, "কোনো সমস্যা নেই"।
- এক লেখায় দুই রকম বানান: যেমন একই অনুচ্ছেদে "সরকারি" ও "সরকারী"।
- দাঁড়ির জায়গায় ফুলস্টপ: বাংলা বাক্য শেষে ।।
- ইংরেজি ও বাংলা অঙ্ক মেশানো: একই লেখায় এক রীতি রাখুন।
AdeptWrite দিয়ে বানান যাচাই
- বাংলা বানান চেকার তিনটি উৎসে কাজ করে: বাংলা শব্দের একটি পুরোনো খোলা অভিধান (bn_BD, Hunspell), বাংলা একাডেমির নিয়মে সাজানো অশুদ্ধ-শুদ্ধ বানান-জোড়া (যেমন বাড়ী → বাড়ি), আর কয়েকটি যান্ত্রিক নিয়ম (দাঁড়ি, নুক্তা-বিন্যাস, কি/কী ইত্যাদি)। প্রতিটি সমস্যার সঙ্গে কারণ দেখায় এবং এক ক্লিকে প্রয়োগ করা যায়।
- বাংলা গ্রামার চেকার ব্যাকরণ, বানান ও যতিচিহ্নের ভুল ধরতে সাহায্য করে।
- বাংলা ওয়ার্ড কাউন্টার শব্দ ও অক্ষর গুনে দেয়, শব্দসীমার পরীক্ষায় কাজে লাগে।
সীমা: একবারে সর্বোচ্চ ৬,০০০ অক্ষর দেওয়া যায়। অভিধানটি পুরোনো, তাই কিছু সঠিক আধুনিক শব্দও ভুল হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে (আমাদের নিজস্ব পরীক্ষায় কয়েকটি সঠিক শব্দ বাদ পড়ার ঘটনা ধরা পড়েছে)। আবার সঠিক বানানের ভুল প্রয়োগ, অর্থের ভুল বা সত্যিকার শব্দের ভুল জায়গায় ব্যবহার টুল সবসময় ধরতে পারে না। টুলের পরামর্শকে সহায়ক ধরুন, শেষ সিদ্ধান্ত আপনার, সন্দেহ হলে অভিধান দেখুন।
আরও পড়ুন
- বাংলা বানান সংস্কার: কী বদলেছে এবং কেন
- বাংলায় ভুল হয় এমন শব্দজোড়া
- বাংলা যতিচিহ্ন ও কমার নিয়ম
- আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাংলা লেখা
টুলগুলো ব্যবহার করুন
সচরাচর জিজ্ঞাসা
বাংলা প্রমিত বানানের নিয়ম কোন প্রতিষ্ঠান ঠিক করে?
বাংলাদেশে মানদণ্ড বাংলা একাডেমির "প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম", যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে এবং পরে সংশোধিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির আকাদেমি বানান অভিধানের (১৯৯৭) প্রভাব বেশি। দুই জায়গায় লিখলে প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা দেখুন।
বাড়ি আর বাড়ী, কোনটি শুদ্ধ?
প্রমিত নিয়মে "বাড়ি" শুদ্ধ। বাড়ি একটি অতৎসম (দেশি) শব্দ, আর অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-কার বসে। একই কারণে গাড়ি, পাখি, সরকারি লেখা হয়। দীর্ঘ ঈ-কার থাকে শুধু তৎসম শব্দে, যেমন উপকারী, ধনী ও মন্ত্রী।
কি আর কী-এর পার্থক্য কী?
"কি" হ্যাঁ বা না উত্তরের প্রশ্নে বসে: তুমি কি যাবে? "কী" কোনো জিনিস, কাজ বা পরিমাণ জানতে চাইলে বসে: তুমি কী খাবে? তোমার নাম কী? সহজ পরীক্ষা: হ্যাঁ-না দিয়ে উত্তর দেওয়া যায় কি না, দেখুন।
বানান চেকার দিয়ে কি বানান পুরোপুরি নির্ভুল হবে?
না। AdeptWrite-এর বানান চেকার অভিধান, একাডেমির নিয়মে সাজানো বানান-জোড়া ও কিছু যান্ত্রিক নিয়ম দিয়ে সম্ভাব্য ভুল দেখায়, কিন্তু সব ভুল ধরে না এবং কিছু সঠিক শব্দকেও চিহ্নিত করতে পারে। সন্দেহ থাকলে অভিধান ও একাডেমির নিয়ম মিলিয়ে নিন।
সম্পর্কিত গাইড
- বাংলা বানান সংস্কার: ১৯৯২-এর প্রমিত নিয়মে কী বদলেছে, কেন বদলেছে, আর আজ কী করবেন — বাংলা একাডেমি ১৯৯২ সালে প্রমিত বানানের নিয়ম প্রকাশ করে, পরে ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে সংশোধন করে। মূল বদল: অতৎসম শব্দে হ্র…
- বাংলায় যেসব শব্দ প্রায়ই গুলিয়ে যায়: শুদ্ধ-অশুদ্ধ তালিকা ও নিয়ম — বাংলায় বেশি গোলমাল হয় ই-কার ও ঈ-কারে (বাড়ি, সরকারি), কী ও কি-তে, কোনো ও কোন-এ এবং স্বাক্ষর-সাক্ষরের মতো জোড়ায়। একাড…
- বাংলা যতিচিহ্ন: দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনসহ সব চিহ্নের ব্যবহার, উদাহরণ ও ভুল — বাংলা বাক্য শেষ হয় দাঁড়ি (।) দিয়ে, ফুলস্টপ (.) বা পাইপ (|) দিয়ে নয়। প্রশ্ন ও বিস্ময়ের শেষে ? আর ! বসে, তখন দাঁড়ি …
- বাংলায় কমা কখন বসবে? কমার ১০টি নিয়ম, শুদ্ধ-অশুদ্ধ উদাহরণসহ — কমা (,) বসে তালিকার উপাদানের মাঝে, সম্বোধনের পরে, বাড়তি অংশের দুই পাশে, শর্তের অংশের পরে, বিপরীত সংযোজকের আগে ও উদ্ধৃতি…
- সাধু ভাষা ও চলিত ভাষা: আনুষ্ঠানিক ও ঘরোয়া লেখার পার্থক্য — সাধু ভাষায় ক্রিয়া ও সর্বনাম লম্বা (করিতেছি, তাহার), চলিতে ছোট (করছি, তার)। আজকের দরখাস্ত, ইমেইল, প্রবন্ধ ও সংবাদে চলিত…