বানান ও ব্যাকরণ

বাংলা বানান সংস্কার: ১৯৯২-এর প্রমিত নিয়মে কী বদলেছে, কেন বদলেছে, আর আজ কী করবেন

AdeptWrite সম্পাদকীয় দলহালনাগাদ 11 মিনিটের পাঠ

বাংলা একাডেমি ১৯৯২ সালে প্রমিত বানানের নিয়ম প্রকাশ করে, পরে ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে সংশোধন করে। মূল বদল: অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-উ, ণ নয় ন, বিদেশি শব্দে স। ঈদ/ইদ এখনো বিতর্কিত।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

বাংলা বানানে সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিক সংস্কার হলো বাংলা একাডেমির "প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম"। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে এবং পরে ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে সংশোধিত হয়। পরবর্তী সংস্করণ বা সংশোধনের কথা এখানে বলা হয়নি; সর্বশেষ রূপের জন্য একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনা দেখুন। ফল সহজ: বাড়ী নয় বাড়ি, সরকারী নয় সরকারি, ঘন্টা নয় ঘণ্টা, ষ্টেশন নয় স্টেশন, রাণী নয় রানি। মূল উদ্দেশ্য ছিল একই শব্দের নানা রকম বানান কমিয়ে একটি প্রমিত রূপ দাঁড় করানো, আর ধ্বনির সঙ্গে যে পার্থক্য আজ আর শোনা যায় না (হ্রস্ব-দীর্ঘ ই-উ, ন-ণ), তা অতৎসম শব্দ থেকে সরিয়ে লেখা সহজ করা।

নিয়মগুলো এখন কীভাবে প্রয়োগ করবেন, তা জানতে বাংলা বানানের নিয়ম গাইড দেখুন। এই লেখা ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট নিয়ে।

এই লেখার সূত্র ও সীমা

বানানের ইতিহাস নিয়ে অনেক কথা চালু আছে, যার সব মূল নথি থেকে মেলানো নয়। তাই এই লেখায় শুধু সুপরিচিত প্রকাশনা-তথ্য আছে: বাংলা একাডেমির "প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম" (প্রথম প্রকাশ ১৯৯২, সংশোধন ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০০) এবং পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির "আকাদেমি বানান অভিধান" (১৯৯৭)। নিয়মের ধারা-নম্বর বা হুবহু বাক্য উদ্ধৃত করা হয়নি, কারণ নিয়মমালা সংশোধিত হতে পারে। প্রতিটি নিয়মের বর্তমান রূপ দেখতে একাডেমির সর্বশেষ নিয়মমালা ও অভিধান দেখুন।

সংস্কারের আগে বানানের অবস্থা

আধুনিক নিয়ম আসার আগে একই শব্দ নানাভাবে লেখা হতো। একই বইয়ে বা একই পাতায় "বাড়ি" আর "বাড়ী", "গাড়ি" আর "গাড়ী" চোখে পড়ত। কারণ বাংলা ধ্বনিতে হ্রস্ব-দীর্ঘ স্বরের তফাত শোনা যায় না, অথচ বাংলা বর্ণমালা সংস্কৃতের কাঠামো থেকে সেই তফাত বহন করছে। লেখকরা কখনো সংস্কৃত বানান অনুসরণ করতেন, কখনো কানে যেমন শুনতেন তেমন লিখতেন, কখনো প্রকাশকের ঘরানা মানতেন।

এর ফল: ছাপা বই, পাঠ্যবই, সরকারি নথি ও সংবাদপত্রে বানান এক রকম থাকত না। শিক্ষার্থীরা কোনটি শুদ্ধ, জানতে পারত না, আর পরীক্ষায় একই বানান কোথাও ঠিক, কোথাও ভুল ধরা হতো।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বিশ শতকের প্রথমার্ধে বানান সংস্কারের একটি আগের প্রচেষ্টার কথা বহু আলোচনায় উল্লেখ করা হয়। সেই উদ্যোগের সাল ও বিষয়বস্তু এখানে আলোচিত হয়নি; ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করলে মূল নথি দেখুন।

১৯৯২ সালের নিয়মে মূল পরিবর্তন

বাংলা একাডেমির নিয়মের কেন্দ্রীয় ধারণাটি সহজ: তৎসম শব্দ অপরিবর্তিত রাখুন, বাকি শব্দকে সরল করুন। ব্যবহারিক ফলাফলগুলো:

  1. অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-কার ও উ-কার: বাড়ি, গাড়ি, পাখি, সরকারি, কুমির।
  2. অতৎসম শব্দে ণ নয়, ন: কোরান, ইরান, রানি।
  3. তৎসম শব্দে ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব নিয়ম বহাল: কারণ, ঋণ, ভাষা, বিষয়।
  4. বিদেশি শব্দে ষ নয়, স: স্টেশন, স্কুল, মাস্টার।
  5. কি ও কী আলাদা: হ্যাঁ-না প্রশ্নে কি, অন্যত্র কী।
  6. কোনো ও কোন আলাদা অর্থে: অনির্দিষ্ট অর্থে কোনো।

সব নিয়মের উদাহরণসহ ব্যাখ্যা আলাদা নিয়ম-গাইডে আছে। এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো, সংস্কারটি বর্ণমালা বদলায়নি, বদলেছে কোন শব্দে কোন বর্ণ বসবে, তার নির্দেশনা।

কেন এই পথে সংস্কার

যুক্তিগুলো সাধারণত তিন ভাগে ব্যাখ্যা করা হয়:

  • শেখার সুবিধা: অতৎসম শব্দে কোথায় ঈ আর কোথায় ই, কোথায় ণ আর কোথায় ন, তা মুখস্থ করা শিশুদের জন্য কঠিন। একটি সরল সূত্র থাকলে শেখা সহজ হয়।
  • সামঞ্জস্য: পাঠ্যবই, সংবাদপত্র ও সরকারি নথিতে একই বানান থাকলে পাঠকের বিভ্রান্তি কমে।
  • ধ্বনির কাছাকাছি লেখা: বাংলা উচ্চারণে যে পার্থক্য শোনা যায় না, তা অতৎসম শব্দের বানানে ধরে রাখার প্রয়োজন কম।

এগুলো সংস্কারকদের ব্যাখ্যার সারকথা। এর বাইরে কোনো পরিসংখ্যান বা গবেষণার দাবি আমরা করছি না। বিপরীত দিকেও যুক্তি আছে: কেউ কেউ মনে করেন, বানান বেশি সরল হলে শব্দের উৎস ও সম্পর্ক ঢাকা পড়ে।

ঢাকা ও কলকাতার ধারা

পশ্চিমবঙ্গে বানান নিয়ে কাজ করেছে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, যার "আকাদেমি বানান অভিধান" ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। দুই ধারার মূল দর্শন কাছাকাছি, কিন্তু আলাদা প্রতিষ্ঠানের আলাদা সিদ্ধান্ত থাকায় কিছু শব্দে পার্থক্য আছে। দুই অভিধানের শব্দ-তুলনা এখানে দেওয়া হয়নি; যে শব্দ নিয়ে সন্দেহ, তা দুই অভিধানেই দেখে নিন।

ব্যবহারিক পরামর্শ: যে পাঠকের জন্য লিখছেন, তাঁর অঞ্চলের নিয়ম মানুন। বাংলাদেশের পাঠ্যবই, সংবাদপত্র বা সরকারি কাজের জন্য বাংলা একাডেমি; পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশনার জন্য সেখানকার আকাদেমি বা প্রকাশকের নির্দেশনা। দুই ধারা মিশিয়ে এক লেখায় ব্যবহার করলে অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে।

আজও বিতর্কিত: ঈদ কি ইদ

অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই নিয়ম অনুযায়ী ঈদ শব্দটি আরবি থেকে আসায় "ইদ" লেখার যুক্তি তৈরি হয়। অথচ বাংলাদেশে ছাপা ও ডিজিটাল লেখায় "ঈদ" ব্যাপকভাবে চলে, বিশেষ করে "ঈদুল ফিতর", "ঈদ মোবারক"-এর মতো ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োগে। বাংলা একাডেমির বর্তমান অভিধানে এই শব্দের কোন রূপ কীভাবে নথিভুক্ত, তা এখানে বলা হচ্ছে না, কারণ এ নিয়ে আলোচনা চলছে। তাই কোনো রায় দেওয়া হচ্ছে না; একাডেমির সর্বশেষ অভিধান দেখুন।

এমন সন্দেহের শব্দে তিনটি পরামর্শ কাজে দেয়:

  1. আপনার প্রতিষ্ঠান বা প্রকাশকের নির্দেশনা দেখুন।
  2. না থাকলে হালনাগাদ একাডেমি-অভিধানে শব্দটি খুঁজুন।
  3. যেটি বেছে নিন, গোটা লেখায় সেটিই রাখুন।

ব্যক্তিনাম, প্রতিষ্ঠানের নাম ও ব্র্যান্ডের বানান আলাদা বিষয়: নামধারী যেভাবে লেখেন, সাধারণত সেভাবেই লেখা হয়।

আগে-পরে সারণি: আজ যা অনুসরণ করবেন

পুরোনো বা প্রচলিত ভুল রূপপ্রমিত রূপযে নিয়ম কাজ করেছে
বাড়ীবাড়িঅতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই
গাড়ীগাড়িঅতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই
পাখীপাখিঅতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই
সরকারীসরকারিঅতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই
ইংরেজীইংরেজিঅতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই
বাংলাদেশীবাংলাদেশিঅতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই
রাণীরানিঅতৎসম শব্দে ন
কোরাণকোরানবিদেশি শব্দে ন
ঘন্টাঘণ্টাট-বর্গের আগে ণ
কন্ঠকণ্ঠট-বর্গের আগে ণ
ষ্টেশনস্টেশনবিদেশি শব্দে স
কোন সমস্যা নেইকোনো সমস্যা নেইকোনো (অনির্দিষ্ট)
তুমি কী যাবে?তুমি কি যাবে?হ্যাঁ-না প্রশ্নে কি

পুরোনো রূপগুলো বহু পুরোনো বই, ওয়েবসাইট ও কপি-করা লেখায় এখনো দেখা যায়। তাই ইন্টারনেট থেকে বানান কপি করলে মিলিয়ে নিন।

আপনি এখন কী করবেন

  • শিক্ষার্থী: পাঠ্যবইয়ের বানান অনুসরণ করুন, শিক্ষক বিশেষ নির্দেশনা দিলে তা মানুন।
  • পেশাজীবী ও লেখক: একটি রীতি বেছে নিন, নিজস্ব ছোট একটি শৈলী-তালিকা রাখুন (যেমন ঈদ বা ইদ, কখনো বা কখনও), আর পুরো লেখায় মেনে চলুন।
  • অনুবাদক ও কনটেন্ট লেখক: মূল পাঠ কোন অঞ্চলের পাঠকের জন্য, তা আগে ঠিক করুন।
  • পুরোনো লেখা হালনাগাদ করা: পুরোনো ব্লগ বা নথির বানান প্রমিত করতে চাইলে একবার বানান চেকারে চালিয়ে নিন।

AdeptWrite কীভাবে সাহায্য করে

  • বাংলা বানান চেকার বাংলা একাডেমির নিয়মে সাজানো অশুদ্ধ-শুদ্ধ জোড়া (যেমন বাড়ী → বাড়ি, সরকারী → সরকারি) থেকে পুরোনো বানান ধরে এবং সংশোধনের পরামর্শ দেয়। এর সঙ্গে আছে একটি পুরোনো খোলা অভিধান আর কিছু যান্ত্রিক নিয়ম।
  • বাংলা গ্রামার চেকার বানান, ব্যাকরণ ও যতিচিহ্ন একসঙ্গে দেখে।

টুলে একবারে সর্বোচ্চ ৬,০০০ অক্ষর দেওয়া যায়। টুল সব ভুল ধরে না, আবার কিছু সঠিক শব্দকেও সন্দেহজনক দেখাতে পারে। পরামর্শগুলো যাচাই করে প্রয়োগ করুন। সন্দেহ হলে একাডেমির অভিধান দেখুন।

আরও পড়ুন

টুলগুলো ব্যবহার করুন

বাংলা বানান চেকার (প্রমিত বানান)
টাইপো আর অপ্রমিত বানান (যেমন বাড়ী → বাড়ি) ধরে সংশোধনের পরামর্শ দেয়, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম মেনে — যাচাই চলে আপনার ব্রাউজারেই।
টুল খুলুন
বাংলা গ্রামার চেকার (ব্যাকরণ চেক)
বাংলা ও অন্যান্য ভাষার ব্যাকরণ, বানান আর যতিচিহ্নের ভুল শুধরে নিন; প্রতিটি বদল আলাদা রঙে দেখানো হয়।
টুল খুলুন

সচরাচর জিজ্ঞাসা

বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানের নিয়ম কবে প্রথম প্রকাশিত হয়?

বাংলা একাডেমির "প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম" প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে এবং ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে সংশোধিত হয়। পরবর্তী সংস্করণের কথা এখানে বলা হয়নি, তাই সর্বশেষ নিয়মের জন্য একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনা দেখুন।

এই সংস্কারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কোনটি?

সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বদল অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-কার ও উ-কার (বাড়ি, সরকারি), অতৎসম ও বিদেশি শব্দে ণ-এর বদলে ন (রানি, কোরান) এবং বিদেশি শব্দে ষ-এর বদলে স (স্টেশন)। তৎসম শব্দ অপরিবর্তিত থাকে।

ঢাকা আর কলকাতার বানানে কি পার্থক্য আছে?

মূল দর্শন কাছাকাছি, কিন্তু দুই আকাদেমি আলাদা প্রতিষ্ঠান, তাই কিছু শব্দে পার্থক্য পাওয়া যায়। আমরা দুই অভিধান শব্দে শব্দে মিলিয়ে দেখিনি। যে অঞ্চলের পাঠকের জন্য লিখছেন, সেখানকার আকাদেমি বা প্রকাশকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

ঈদ লিখব, না ইদ?

এটি এখনো বিতর্কিত। ব্যাপক প্রচলনে "ঈদ" দেখা যায়, আবার অতৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-র সূত্র ধরলে "ইদ" লেখার যুক্তিও আসে। আপনার প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা বা হালনাগাদ একাডেমি-অভিধান দেখুন, আর গোটা লেখায় একই রূপ রাখুন।

সব গাইড